

জীবনের
দীর্ঘ ৯৫ বছর পার করেছেন হাজী শামসুল হক মোল্লা। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে
অক্লান্ত পরিশ্রমে বড় করেছেন ছয় সন্তানকে।
অথচ
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সন্তানদের কারও কাছেই ঠাঁই হয়নি তার। শেষ বয়সে তাই তার
ঠিকানা হয়েছে বাড়ির পাশের একটি গাছতলা।
বৃদ্ধ
হাজী শামসুল হক মোল্লা গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরন গ্রামের ওমেদ
আলী মোল্লার ছেলে। ৯৫ বছর বয়সে এসে আপনজনদের কাছ থেকে এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে গাছতলাকেই
এখন নিজের শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিতে হয়েছে তাকে।
স্থানীয়দের
সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয় সন্তানের সবাই মিলে তার জমিজমা লিখে নেওয়ার পর তাকে বাড়ির
পাশে একটি গাছের নিচে রেখে দিয়েছেন। সেখানেই এখন মানবেতর কাটছে এই বৃদ্ধের।
হাজী
শামসুল হক মোল্লার দুই ছেলে ও চার মেয়ে। বড় ছেলে আজিজুল মোল্লা পেশায় একজন ফেরিওয়ালা
এবং ছোট ছেলে রেয়াজুল মোল্লা বাসের হেলপার। চার মেয়ের মধ্যে মায়া বেগম, সাবিনা বেগম
ও সালমা বেগম বিবাহিত। ছোট মেয়ে কাজুলী বেগম শারীরিক প্রতিবন্ধী।
বৃদ্ধ
শামসুল হকের ছোট মেয়ে কাজুলী বেগম ছাড়া বাকি পাঁচ সন্তানই নিজেদের সংসার ও সন্তানদের
নিয়ে ব্যস্ত। কয়েক বছর আগে নিজের জমি বিক্রি করে হজ পালন করতে যান শামসুল হক। এ সময়
অবশিষ্ট জমিজমা সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন। তবে বর্তমানে বিপত্নীক এই বৃদ্ধের খোঁজখবর
সন্তানদের কেউই তেমন রাখেন না বলে জানা গেছে।
গত
কয়েক দিন ধরে বড় মেয়ে মায়া বেগমের বাড়িতে ছিলেন হাজী শামসুল হক। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে
মায়া বেগম তার বৃদ্ধ বাবাকে ভাইদের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে ভাই ও তাদের স্ত্রীরা মিলে
শামসুল হক মোল্লাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে তাকে বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচে রেখে
আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
৯৫
বছর বয়সী এক বৃদ্ধ বাবার প্রতি সন্তানদের এমন আচরণের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের
মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। বৃদ্ধ বাবাকে রাখতে না চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে
মেয়ে মায়া বেগম বলেন, “আমার স্বামী অসুস্থ। তার ওপর আমার বাড়িতে আবার প্রতিবন্ধী ছোট
বোন কাজুলী থাকে। যার কারণে আমার পক্ষে আমার বাবাকে রাখা সম্ভব নয় ।”
শামসুল
হকের মেঝ মেয়ে সাবিনা বেগম বলেন, “আমাদের চার বোনকে জমি বিক্রি করে মাত্র চার লাখ টাকা
করে দিয়েছে। বাবা দুই ভাইকে নগদ টাকাসহ ৮ কাঠা করে জমি দিয়েছে। এখন আমরা বোনেরা কেন
বাবার দেখাশুনা করবো?”
এ
বিষয়ে জানার জন্য শামসুল হক মোল্লার দুই ছেলে আজিজুল ও রেয়াজুলের বাড়িতে গিয়ে তাদেরকে
পাওয়া যায়নি। তাদের স্ত্রী-রা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে
পাশের বাড়ির এক গৃহিনী বলেন, “শামসুল হক মোল্লার জমি জমা লিখে নিয়ে এখন তার সন্তানরা
তাকে আশ্রয় দিচ্ছে না। তিনি যদি সন্তানদের জমি লিখে না দিতো তা হলে হয় তো এই অবস্থা
হতো না। সন্তানরা যেটি করছেন সেটি কোন ভাবেই কোন পিতার জন্য কাম্য নয়।”
কান্নাজরিত
কণ্ঠে শামসুল হক বলছিলেন, “আমি এখন কোথায় যাবো? কি করবো? কিছুই বুঝতে পারছি না। সারাজীবন
কষ্ট করে যাদের বড় করলাম তাদের কাছে আমি এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছি।”
ঘটনার
বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফ-উল-আরেফীন বলেন,
“বিষয়টি আমি জেনেছি। আমি ঘটনাস্থলে যাচ্ছি।
“শামসুল হক সাহেবের সন্তানেরা যদি তার
দেখাশোনা না করেন তা হলে তাদের বিরুদ্ধে 'পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ' আইন অনুসারে শাস্তির
ব্যবস্থা করা হবে।”
মন্তব্য করুন