

এক
মাস আগে বরিশালের কাউনিয়া বৃদ্ধাশ্রমে এসেছেন রুমা রোকসানা। জীবনের নানা প্রতিকূলতায়
তিনি ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষিত সমাজে বড় হয়েছি। শিক্ষিত সমাজ থেকে এই বৃদ্ধাশ্রমে
এসে ভালো আছি, এখানে খাবার, ওষুধ— সবকিছু দেয়। এখন মৃত্যুর চিন্তা করি।
কবে মৃত্যু হবে।’
বরিশালের
কাউনিয়া এলাকায় অবস্থিত এই বৃদ্ধাশ্রমে ঢাকার মগবাজারের রোকসানার মতো ঝালকাঠির গীতা
রানী সমদ্দারসহ অনেকের ঠাঁই হয়েছে।
রুমা
রোকসানা তার জীবনের কাহিনি শোনাতে গিয়ে বলেন, ‘১৯৭৫ সালে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী স্কুল থেকে
ম্যাট্রিক ও ১৯৭৭ সালে হলি ক্রস থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করি। পরে ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
মার্কেটিং বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করি। সেখানে আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট
হয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশে
আট বছর সিনিয়র অফিসার পদে কাজ করেছি। তবে চাকরি ছেড়েছিলাম মায়ের দেখাশোনা করার জন্য।
মা-বাবা দুজনই আইন পেশায় ছিলেন। চাকরি ছাড়ার পর ২০ হাজার টাকার কিছু বেশি পেয়েছিলাম।
সেই টাকা দিয়ে বাবার জমিতে কয়েকটি ঘর উঠিয়েছিলাম, সেখান থেকে ভাড়া পেতাম এবং মায়ের
দেখাশোনা করতাম। আমার তিন ভাই ছিল, তারা মায়ের খাবার দিত শুধু।’
৬৭ বছর বয়সী রুমা আরও বলেন, ‘১৯৯৯ সালে মায়ের মৃত্যু হয়। তার দেখাশোনা করতে করতে আমারও
বয়স হয়ে গিয়েছিল। ২০০৩ সালে বিয়ে করি হানিফ হাওলাদারকে। তার ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়ের
কিছুদিন পর বুঝতে পারি, তিনি বিয়ে করেছিলেন আমার সম্পত্তির জন্য। স্বামী শিক্ষক ছিলেন।
তাকে ব্যবসার জন্য ১৭ লাখ ৬ হাজার টাকাও দিয়েছিলাম। ব্যবসায় লস ও ধারদেনায় জর্জরিত
হয়ে পড়েন তিনি। ২০ বছর সংসার করার পর তিন বছর আগে তিনি মারা যান। আমি আরও অসহায় হয়ে
পড়ি। এরপর বরিশালে সোনামিয়ারপুল এলাকায় আমার দেবরের বাসায় কিছুদিন থাকি। তারাও আর আমাকে
রাখতে চায়নি। এরপর খালাতো বোনের কাছে তিন বছর ছিলাম। সেখান থেকে ভাইদের কাছে চলে যাই।
তাদের মধ্যে এক ভাই আমাকে এক হাজার ও অন্য ভাই ১২০০ টাকা দিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে বললেন।’
রোকসানা
বলেন, ‘ভাইদের কাছ থেকে পটুয়াখালীর বগায় মামাবাড়িতে চলে যাই। তারা এক মাস আগে আমাকে
এই বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে গেছে। এখন আর কোনো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। স্বজনরা সবাই
ভালো অবস্থানে ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গেট টুগেদার অনুষ্ঠানে এক সহপাঠী আমাকে
৯০ হাজার এবং আমার বড় ভাই প্রতি মাসে ৩ হাজার করে মোট ৭২ হাজার টাকা দিয়েছিল। আমি যে
খালাতো বোনের কাছে ছিলাম, সেই টাকা তার কাছে দিয়েছিলাম রাখতে। আমি আর সেই টাকা পাইনি।’
ঝালকাঠি
শহরের গীতা রানী সমদ্দারও এই বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন। তিনি চার মাস ধরে এখানে আছেন। তার
স্বামী দিলীপ সমদ্দার ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি সন্তানদের কোনোভাবেই
দোষারোপ করতে রাজি নন এবং বলেন, এটি নিয়তির খেলা।
গীতা
রানী জানান, তার তিন মেয়ে, সবার বিয়ে হয়েছে এবং সবাই গৃহিণী। বড় মেয়ে ঢাকায় রয়েছে এবং
তার স্বামী একটি গার্মেন্টসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অন্য দুই মেয়ের মধ্যে একজন খুলনা
এবং অন্যজন পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিতে থাকেন। ৬৫ বছর বয়সী গীতা বলেন, ‘স্বামীর পেনশনের
টাকা নিয়মিত পেতাম; কিন্তু চার মাস থেকে আর পাচ্ছি না। এখন কেউ টাকা নেয় কি না, জানি
না। এর আগে বড় মেয়ের সঙ্গে ঢাকায় ছিলাম। তবে তাদের সেখানে আমাকে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে,
তাই জামাই এই বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে গেছে। সে মাসে চার হাজার টাকা পাঠায় আমার ওষুধের জন্য।
আর খাবার ও থাকার খরচ তো এই বৃদ্ধাশ্রম থেকেই দেওয়া হয়।’
গীতা
রানী আরও বলেন, ‘খুলনা ও স্বরূপকাঠিতে যে দুই মেয়ে থাকে, তারা কেউ আমাকে নিতে চায় না।
তাদেরও সংসার-শ্বশুরবাড়ি রয়েছে। সেখানে আমি বোঝা হতে চাই না। সন্তানদের প্রতি আমার
কোনো অভিযোগ নেই। আমার তো সন্তান, নাতি-নাতনি রয়েছে। তাদের জন্য মায়া লাগে। তাদের দেখতে
না পেয়ে কষ্ট হয়।’
বরিশাল
নগরীর কাউনিয়ার বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে এখানে ৭০ জন বৃদ্ধ
মা রয়েছেন। আমার মায়ের সেবা যেভাবে করেছি, তাদেরও ঠিক সেভাবে সেবা করছি। এখানে শুধু
বরিশালের নয়— ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার বৃদ্ধ মা রয়েছে।
তাদের তিনবেলা খাবার ও চিকিৎসা আমরা দিয়ে থাকি।’
তিনি
আরও বলেন, ‘যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে রুমা রোকসানার গল্পটা ভিন্ন। এত শিক্ষিত একজন মানুষ
পদে পদে প্রতারিত হয়েছেন। তাকে দেখভাল করছি আমরা। আপনাদের সবার সহযোগিতা পেলে বৃদ্ধাশ্রম
আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে বৃদ্ধ মায়েদের সেবার মানও বৃদ্ধি করা সম্ভব
হবে।’
মন্তব্য করুন